যেভাবে মঠবাড়িয়া বিজয় হয়।
- আপডেট সময় : ০২:২৬:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ নভেম্বর ২০২২ ৩৬৮ বার পড়া হয়েছে
১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর ভারতের পূর্বাঞ্চলের কমান্ড প্রধান লেঃ জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ কমান্ড গঠিত হয়। ফলে মুক্তিযুদ্ধ আরো বেগবান হয়। যৌথ বাহিনীর আক্রমনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পিছু হটতে থাকে। এরূপ অবস্থায় ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পাকিস্তান বিমান বাহিনী ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের অমৃতসর, পাঠানকোট, আগ্রা, শ্রীনগর, অবন্তীপুর ইত্যাদি ৮টি শহরে বোমা বর্ষন করে ।এ সময়ে ভারতের প্রধান মন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী কোলকাতায় ছিলেন। সংবাদ পেয়ে দিল্লী ফিরে যান এবং রাতে মন্ত্রী সভার সভা করেন। মধ্য রাতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি,ভি, গিরি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তিনি সমগ্র ভারতে জরুরী অবস্থা ঘোষণা এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ৬ ডিসেম্বর বেলা ১১ ঘটিকায় ভারত সরকার বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। ভারতের এক ঘন্টা আগে ভূটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। এ স্বীকৃতির পর মুক্তিযুদ্ধ আরও বেগবান হয়। ভারত স্বীকৃতি দেয়ায় পাকিস্তান ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। ভারতের সাথে যুদ্ধের প্রয়োজনে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক লেঃ জেনারেল অামির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী থানা, মহকুমা ও জেলা থেকে সেনা বাহিনী প্রত্যাহার করলে ক্যাপ্টেন এজাজ অাহমেদ তার বাহিনী নিয়ে ৭ ডিসেম্বর মঠবাড়িয়া ত্যাগ করে পিরোজপুর চলে যায়। ক্ষমতা থাকে পুলিশ ও রাজাকারদের হাতে। ৮ ডিসেম্বর কর্নেল অাতীক মালিক এবং ক্যাপ্টেন এজাজ সকালে তার বাহিনী নিয়ে পিরোজপুর ছেড়ে বরিশাল চলে যায়।
সুন্দরবন সাব সেক্টরের সহ অধিনায়ক শামসুল আলম তালুকদার দুই শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে ৫ ডিসেম্বর শরণখোলা থানার সদর দপ্তর রায়েন্দা আক্রমন করেন। অভিযান ব্যর্থ হয়। এ অভিযানে শহীদ হন গুরুপদ বালা, টিপু সুলতান, শেখ আবুল আসাদ, আলতাফ হোসেন সিকদার ও আলাউদ্দিন। বিজয়ের পূর্বে এটি ছিল অপ্রত্যাশিত ঘটনা। ইতোপূর্বে এ সাব -সেক্টরের ইতিহাসে এমনটি আর ঘটে নি।
শামসুল আলম তালুকদার বিষয়টি সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন জিয়া উদ্দিন কে অবহিত করলে তিনি অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও রায়েন্দা পুনঃ আক্রমনের নেতৃত্ব গ্রহন করেন। তাঁর নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকার ক্যাম্পের ওপর ঝাপিয়ে পড়েন। তিনি রাজাকার ক্যাম্পের ওপর ৬/৭টি ৩ ইঞ্চি মর্টার নিক্ষেপ করলে ভবনটি ভেঙ্গে যায়। অনেক রাজাকার মরা যায় এবং অনেকে পালিয়ে যায়। এ যুদ্ধে ৮০ জন রাজাকার মারা যায়।
মঠবাড়িয়া থানা ছিল রাজাকারদের শক্ত ঘাঁটি। এখানে পাঁচ শতাধিক রাজাকার ছিল। রায়েন্দায় রাজাকারদের পতনের পর মঠবাড়িয়ার রাজাকার বাহিনী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী ৭ ডিসেম্বর মঠবাড়িয়া থেকে চলে গেলে রাজাকার বাহিনীর গতিবিধি সীমিত হয়ে পড়ে। সুন্দর বন সাব-সেক্টরের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার ক্যাপ্টেন আলতাফ হোসেন আকনের নেতৃত্বে বিনা রক্তপাতে মঠবাড়িয়া থানা দখলের প্রচেষ্টা চলতে থাকে। তিনি মঠবাড়িয়ার রাজাকার বাহিনীকে সারেন্ডার করার আহবান জানিয়ে বলেন, সারেন্ডার করলে তাদের নিরাপত্তা বিধান করা হবে।ব্যর্থতায়, তাদেরকে চরম শাস্তি ভোগ করতে হবে।
ভারত -বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর আক্রমণে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক গভর্নর ডাঃ আবদুল মোতালিব মালিক ও তাঁর মন্ত্রী সভার সদস্যরা ১৪ ডিসেম্বর পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ ও নিরাপদ স্থান হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল এস,এইচ,এফ,মানেকশ পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার লেঃ জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজীকে সারেন্ডার করার জন্যে ঘনঘন বার্তা প্রেরন করতে থাকেন। আবস্থা বেগতিক দেখে জেনারেল নিয়াজী ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল এম, স্পিভ্যাককে অনুরোধ করেন এ ব্যাপারে মধ্যস্থতা করার জন্যে। তিনি জেনারেল নিয়াজীকে জানান যে, এ ব্যাপারে তিনি মধ্যস্থতা করতে পারেন না। তবে সারেন্ডারের বার্তাটি যথাস্থানে পৌঁছিয়ে দিতে পারেন। মিঃস্পিভ্যাক সারেন্ডারের বিষয়টি সরাসরি জেনারেল মানেকশ এর নিকট বা দিল্লীতে না পাঠিয়ে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরে প্রেরণ করেন। লেঃ জেনারেল নিয়াজীর নিকট থেকে কোন বার্তা না পেয়ে জেনারেল মানেকশ ১৫ ডিসেম্বর সকালে বেতার মারফত নিয়াজীকে জানিয়ে দেন যে, এরপরও যদি আপনি আপনার পুরো বাহিনী সহ সারেন্ডার না করেন, তাহলে ১৬ ডিসেম্বর ৯ ঘটিকার পর ব্যাপকভাবে আঘাত করার জন্যে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হবে।
ভারতের ১০১ কমিউনিকেশন জোনের শিখ কমান্ডার মেজর জেনারেল গন্ধর্ব নাগরা তাঁর বাহিনী আবদুল কাদের সিদ্দিকীর কাদেরিয়া বাহিনীকে সাথে নিয়ে ১৬ ডিসেম্বর সকালে মিরপুর ব্রীজের উত্তর প্রান্তে পৌঁছেন এবং সকাল সাড়ে আট ঘটিকায় জেনারেল নাগরা চিঠি প্রেরন করেন লেঃ জেনারেল নিয়াজীকে সারেন্ডার করার জন্যে। উল্লেখ্য, মেজর জেনারেল নাগরা এবং লেঃ জেনারেল নিয়াজী কলেজ ও দেরাদুন মিলিটারী একাডেমী জীবনের বন্ধু ছিলেন। মেজর জেনারেল নাগরা চিঠিতে লিখেনঃ
প্রিয় আবদুল্লাহ,
আমি এখন মিরপুর ব্রীজে। ঘটনার পরিসমাপ্তি হতে যাচ্ছে। আমার পরামর্শ, তোমরা আমার নিকট সারেন্ডার করো। সেক্ষেত্রে আমরা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তোমাদের সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণ করবো। সত্বর তোমার প্রতিনিধি প্রেরণা করো। ইতি
তোমারই
মেজর জেনারেল নাগরা
সকাল ৮-৩০ মিনিট
তারিখ ১৬/১২/১৯৭১
লেঃ জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী সারেন্ডার করার ইচ্ছা ব্যক্ত করে তাকে অভ্যথর্না জানানোর জন্যে ঢাকার জি,ও,সি, মেজর জেনারেল মোঃ জামসেদকে প্রেরণ করেন। সারেন্ডারের দলিল এবং সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের বিষয় চূড়ান্ত করার জন্যে দুপুরে একটা বিশেষ বিমানে ঢাকায় আসেন ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চীফ অফ স্টাফ মেজর জেনারেল জে,এফ,আর,জ্যাকব। বিকাল চার ঘটিকার আগেই ঢাকায় আসেন ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান এবং ভারত -বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর প্রধান লেঃ জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও বাংলাদেশ বাহিনীর ডেপুটি চীফ অফ স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম খন্দকার এবং ভারতের অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধিগণ। বিকাল ৪-৩১ মিনিটে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষাধিক জনতার উপস্থিতিতে লেঃ জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী বাংলাদেশে অবস্থিত ৯১,৪৯৮ জন সৈনিক ও অফিসারসহ বিনা শর্তে লেঃ জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এর নিকট সারেন্ডার দলিলে স্বাক্ষর করেন। সারেন্ডার দলিলে আনুষ্ঠানিকভাবে লেঃ জেনারেল নিয়াজীর স্বাক্ষরের সাথে সাথে পরিসমাপ্তি ঘটে মানব ইতিহাসের এক করুণতম ও বেদনাময় ঘটনা। এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বাহিনীর উপ প্রধান সেনাপতি ও বিমান বাহিনীর প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ,কে, খন্দকার। আমরা অর্জন করি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।
১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী সারেন্ডার করার পরও মঠবাড়িয়ার রাজাকার বাহিনী সারেন্ডার করে নি। মঠবাড়িয়া থানা দখলের জন্যে সুন্দর বন সাব-সেক্টরের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন আলতাফ হোসেন আকনের নেতৃত্বে ৩৮ জন মুক্তিবাহিনীর একটা দল মঠবাড়িয়া থানা ভবন থেকে চার কিলোমিটার দূরবর্তী পশ্চিমে কালিরহাটে অবস্থান করেন। এ দলে ছিলেন কামাল উদ্দিন আহমেদ (সুন্দর বন সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন জিয়া উদ্দিন এর ভাই), মাহতাব উদ্দিন আকন, বাচ্চু আকন, গাউস আকন (ফুলঝুরি), সুবেদার সোহরাব হোসেন (বুড়িরচর), সুবেদার ফুলমিয়া গাজী (পশ্চিম ফুলঝুরি), হাবিলদার তুজাম্বর আলী হাওলাদার (ধানিসাফা) , আবুল হোসেন আকন, বেলায়েত হোসেন আকন (বেতমোর), মোশাররফ হোসেন তালুকদার ,(জরিপেরচর), শাহজাহান খান (চরকখালী), নুজরুল ইসলাম বাবুল (দক্ষিণ সোনাখালী) , কাঞ্চন আলী হাওলাদার (উলুবাড়িয়া), কাঞ্চন হাওলাদার (বেতমোর), আবদুল আজিজ আকন (বেতমোর), আবদুল আজিজ সিকদার (জরিপেরচর), আবদুর রহমান ( বাদুরা) , আবদুল হক, রত্তন আকন (মানিকখালী), সিরাজুল ইসলাম রত্তন, আনসার আলী হাওলাদার ( ধানিসাফা), কেরামত আলী (বেতমোর), মোতাহার আলী হাওলাদার ( ফুলঝুরি), পনু মিয়া (বেতমোর) , আবদুল মান্নান, আবদুস সত্তার (বেতমোর), জামিউল হক (গোপখালী), রুহুল আমিন ফরাজী (বেতমোর) , আলী আকবর (তুষখালী), দেলোয়ার হোসেন ইউনুস (বেতমোর), গোলাম রহমান আকন (মিরুখালী) , আলম মিয়া( বামনা) , জাহাঙ্গীর হোসেন আকন (শরণখোলা), ইকবাল হোসেন, মোয়াজ্জেম হোসেন (ভান্ডারিয়া), (চিত্ত রঞ্জন (বাগেরহাট), সুনীল গাঙ্গুলী (মংলা) । ক্যাপ্টেন আলতাফ হোসেন আকন ১৭ ডিসেম্বর সকালে মঠবাড়িয়া সার্কেল পুলিশ প্রধান কাজী জালাল উদ্দীনের নিকট একখানা চিঠি প্রেরন করেন। চিঠিতে বলা হয় যে,১৮ ডিসেম্বর সকালে সারেন্ডার না করলে মঠবাড়িয়া থানা আক্রমন করা হবে। কাজী জালাল উদ্দীন এবং রাজাকার বাহিনী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে রক্তপাত এড়ানো জন্যে সারেন্ডারের মধ্যস্থতা করার জন্যে খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দারকে অনুরোধ করেন। খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার ১৮ ডিসেম্বর শনিবার সকালে আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম ধলু মিয়া ও পুলিশ সার্কেল প্রধান এবং রাজাকার বাহিনীর প্রধান কাজী জালাল উদ্দীনসহ রিকশায় কালিরহাট গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাগণের সাথে সাক্ষাৎ করে রাজাকার বাহিনীর সারেন্ডারে মধ্যস্থতা করেন। কাজী জালাল উদ্দীন থানার চাবি ক্যাপ্টেন আলতাফ হোসেন আকনের নিকট হস্তান্তর করেন। ফলে বিনা রক্তপাতে মঠবাড়িয়া বিজয় হয়। রাজাকার বাহিনী সারেন্ডার করার পর এদিন হাজার হাজার মানুষ জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়ে মঠবাড়িয়ায় আনন্দ মিছিল করেন। প্রায় নয় মাস যাবত হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসর শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত ও নিগৃহীত জনগণের রোষানলে পড়ে পদপিষ্ট হয়ে মারা যায় রাজাকার কমান্ডার আলগীর হেমায়েত সুফি এবং রাজাকার বাহিনীর জল্লাদ উত্তর মিঠাখালী গ্রামের আবদুর রহমান। অনেক কুখ্যাত রাজাকার ১৬ ডিসেম্বর রাতে মঠবাড়িয়া থেকে পালিয়ে গিয়েছে। মঠবাড়িয়ার শান্তি -শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেন ক্যাপ্টেন আলতাফ হোসেন আকন। তিনি ১৯ ডিসেম্বর কাজী জালাল উদ্দীনকে গ্রেফতার করেন। এরপর মঠবাড়িয়া থানা শান্তিকমিটির প্রভাবশালী সদস্য সাপলেজা ইউনিয়নের নুরুল হোসেন মৃধা, হলতা-গুলিসাখালী ইউনিয়নের বাহার আলী হাওলাদার, মিরুখালী ইউনিয়নের ফখরুল ইসলাম দাউদখালী ইউনিয়নের ফজলে আলী খান প্রমুখ।













