সুন্দরবনের দুবলার আতঙ্ক শফিউল্লাহ খোকন রাজাকার গা ঢাকা দিয়েছে
- আপডেট সময় : ০২:০৬:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ ৪৩৯ বার পড়া হয়েছে
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় উপজেলা পাশ দিয়ে বয়ে গছে বলেশ্বর নদী। নদীর ওপারেই সুন্দরবন। সুন্দরবরেন দুবলার আতঙ্ক শফিউল্লাহ খোকন (৭৩) রাজাকার গা ঢাকা দিয়েছে। চার দশকে হয়ে উঠেছেন সুন্দরবনের দুবলার চর মৎস্যপল্লীর অঘোষিত রাজা। প্রভাব আর আধিপত্য বিস্তরের মাধ্যমে নিরীহ জেলেদের শাসন ও শোষণের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। আত্মগোপনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের ভাষ্য, যুদ্ধাপরাধ মামলার তদন্ত শুরু হওয়ায় পালিয়েছেন খোকন। যুদ্ধাপরাধ মামলা থেকে রেহাই পেতে উচ্চ মহলে তদবির চালাচ্ছেন বলে ভাষ্য অনেকের। তিনি খুলনার রূপসা উপজেলার দেয়ারা এলাকার বাসিন্দা।
দুবলার চরের জেলে ও শুঁটকি ব্যবসায়ী গাজী রহমান, কেরামত মল্লিক ও বোরহান গাজীর দাবি, যুদ্ধাপরাধের তদন্তের খবর পেয়ে খোকন চর ছাড়ায় স্বস্তি ফিরেছে জেলে পল্লীতে। দু’দিন ধরে মিষ্টি বিতরণ হয়েছে। তার বিচার চেয়ে মঙ্গলবার বিক্ষোভ মিছিল করেছেন ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্টরা।
রাজাকার খোকনের নির্যাতনের শিকার মঠবাড়িয়ার উপজেলার তুষখালী গ্রামের মামুন শরীফ ও মফিজুল শরিফ জানান, অত্যচার ও নির্যাতনে মাছের ব্যবসায় নিঃস্ব হয়েছেন অনেকে। তাদের পরিবারও দুবলা থেকে ব্যবসা গুটিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে।
দুবলা ফিশারম্যান গ্রæপের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, জেলে ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ ও উল্লাসের খবর তিনি শুনেছেন। দুবলা ফিশারম্যান গ্রæপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুর রহমান ওরফে শ্যাম মল্লিককে হত্যার দায়ে খোকনসহ তিনজনকে আসামি করে ২০২২ সালে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন নিহতের ছেলে সাইফুল মল্লিক গামা। গত ২৫ জানুয়ারি তদন্তকারী কর্মকর্তারা রূপসা থানায় এসে সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
মামলার বাদী, সাক্ষী, চরের মৎস্য ব্যবসায়ী নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্তত ১৩ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রজীবনে ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফ্রন্টের (এনএসএফ) সক্রিয়কর্মী ছিলেন শফিউল্লাহ খোকন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ১৯৬৮-১৯৬৯ সালে খুলনায় মুসলিম রীগের প্রভাবশালী নেতা খান এ সবুর এর লাঠিয়াল বাহিনীর প্রভাবশালী সদস্যহন খোকন। এরপরই শুরু হয় খোকনের শাসন ও শোষণ।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় খান আমজাদ হোসেন রাজাকার বাহিনীর খুলনা জেলা কমান্ডার হওয়ার পর তার দলে যোগ দেন খোকন। পরে তাকে বর্তমান রূপসা (সাবেক খুলনা) থানার দেয়ারা এলাকার রাজাকার কমান্ডার নিযুক্ত করেন। তখন সে ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি রাজাকার বাহিনী গঠন করেন। সে সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুর রহমান ওরফে শ্যাম মল্লিককে খোকন গুলি করে নিজ হাতে হত্যা করে। খোকন ও তার বাহিনীর হাতে আরও দুটি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া নারী ধর্ষন ও অগ্নিকান্ডের ঘটনাও ঘটিয়েছে খোকন ও তার সহযোগীরা।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর খোকন ভারতে পালিয়ে যায়। দু’বছর আত্মগোপনে থাকার পর দেশে ফিরে বটিয়াঘাটা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। ১৯৮৩-৮৪ সালে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অবঃ) জিয়াউদ্দিনের পাশাপাশি দুবলার চরে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। কিন্তুু মেজর (অবঃ) জিয়া জানতেন না খোকন রাজাকার ছিলো। ২০১৭ সালে দুবলা ফিশারম্যান গ্রæপের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়া উদ্দিন মারা যান। এরপর কামাল উদ্দিন আহমেদ দুবলা ফিসারমেন গ্রæপের সভাপতি হন আর সহ সভাপতি হন খান শফিউল্লাহ খোকন। এরপর তার প্রভাব আরো বাড়াতে থাকে। তবে চরের ‘স্বঘোষিত শাসক’ খাকন প্রায় ১০দিন ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন। এর পরই শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ খুলনা জেলা ইউনিট কমান্ডের কমান্ডার সরদার মো. মাহাবুবুর রহমান বলেন, শফিউল্লাহ খান খোকন তালিকাভুক্ত রাজাকার কমান্ডার। রূপসার রাজাকারের তালিকায় তার নাম রয়েছে।
খুলনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক সহকারী কমান্ডার বজলুর রশিদ আজাদ জানান, মুক্তিযুদ্ধকালে খোকন রূপসার আইচগাতী ইউনিয়নের রাজাকারের কমান্ডারের দায়িত্বে ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাসহ এমন কোনো বেআইনি কর্মকান্ড নেই, যা খোকন ও তার বাহিনীর সদস্যরা করেনি। এত বছরেও তাদের বিচার হয়নি।
এসব বিষয়ে আত্মগোপনে থাকা খান শফিউল্লাহ খোকনের বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন নম্বরে কল করা হলেও বন্ধ পাওয়া যায়। খুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর সাড়া মেলেনি।













